বজ্রপাত ঠেকাতে তাল গাছ নয়, দেশব্যাপী তালের আঁটি (বীজ) লাগানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলা বাদ দিয়ে ৬১টি জেলায় কমবেশি পরিমাণের তালের বীজ লাগানো হয়েছে। সামনে আরও লাগানো হবে। এ পর্যন্ত ২৮ লাখ তালের বীজ লাগানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ্ কামাল।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের আওতায় সারা দেশে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচি চলছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রধান শর্তই দেওয়া হয়েছে এর আওতায় নির্মিত রাস্তার দুই পাশে তালের আঁটি লাগাতে হবে। বন বিভাগের পরামর্শে রাস্তার দুই পাশে লাগানো তালের আঁটি লাগানো কার্যক্রম স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ তত্ত্বাবধান করবে। প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও প্রতিটি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা সরকারের এই কার্যক্রম নজরদারি করবে বলেও নির্দেশনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের জন্য গতবছর নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের পক্ষে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইতোমধ্যেই গত এক বছরে সরকারি উদ্যোগে ২৮ লাখ তালের আঁটি (বীজ) রোপণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গ্রামে-গঞ্জে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ ও নারিকেল গাছ থাকলে সেগুলো বজ্র নিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে বজ্রপাতে নিহত হওয়ার ঘটনা এড়ানো যাবে বলে আশা করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
দেশে বজ্রপাতের ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। গতবছর ২০১৭ সালে দেশে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে চারশ’ মানুষ। এর মধ্যে একদিনেই মারা যান ৮২ জন। আর ২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত গত সাত বছরে বজ্রপাতে নিহতের পরিমাণ দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৯ ও ৩০ এপ্রিল এই দুই দিনে দেশে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ৩২ জন রেকর্ড করেছে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। বিষয়টি এখন অনেকটাই আতঙ্কও বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যা সংবাদমাধ্যমসহ দেশের সর্বত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
বর্তমানে অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনায় এখন কালবৈশাখী-ঘূর্ণিঝড়, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প-অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে নতুন দুর্যোগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বজ্রপাত। বিষয়টি সরকারকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এটিকে নতুন দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ কারণেই ২০১৫ সাল থেকে বজ্রপাতকে সরকারিভাবে দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় সর্বত্রই তালগাছসহ বড় বড় গাছের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে যাওয়ার কারণে বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনও বড় গাছের ওপর পড়তো। বজ্রপাত এক ধরনের বিদ্যুৎ রশ্মি। তাই বজ্রপাতের ওই রশ্মি গাছ হয়ে তা মাটিতে চলে যেত। এতে জনমানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। কিন্তু এখন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলেও এখন আর তালগাছ দেখা যায় না। একইভাবে বড় আকারের গাছও এখন আর তেমন নেই। দেশব্যাপী বনায়ন হলেও তা আকারের দিক থেকে বড় হয়ে ওঠেনি। মূলত এ কারণে বজ্রপাতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া বজ্রপাতের আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। তাই এ দুর্যোগ থেকে সাধারণ মানুষ যেন রেহাই পায় সেজন্যই দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, দেশের জনসাধারণকে দিনের শুরুতেই ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ১০৯০ নম্বরে ফোন করে আবহাওয়া সম্পর্কে জেনে নেওয়ার অনুরোধ করছি। এ জন্য কোনও অপারেটর থেকেই চার্জ দিতে হবে না। যেহেতু কালবৈশাখী ঝড়ের কোনও আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। সেহেতু কালবৈশাখী ঝড়ের সময় সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে না বেরুনোরও পরামর্শ মন্ত্রীর। অপর এক প্রশ্নের জবাবে মায়া বলেন, তাল গাছ বজ্রপাত নিরোধক বলে সরকার দেশব্যাপী তাল গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আলোকে ইতিমধ্যেই ২৮ লাখ তালের বীজ লাগানো হয়েছে। তালগাছ লাগানোর এ কর্মসূচি চলবে।  
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশবাসীর জন্য এসব ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। জনসাধারণের মধ্যে এ সংক্রান্ত সচেতনতা বাড়লে দুর্যোগ এবং এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে বলেও জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল বলেছেন, কাবিখা কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী নির্মিত রাস্তার দুইপাশে তালের বীজ লাগানো হয়েছে। এ শর্ত দিয়েই কাবিখা চলছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এর দেখভাল করছে। ডিসি, ইউএনও এবং জেলার ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সামগ্রিকভাবে এর মনিটর করছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে শাহ কামাল বলেন, তালের বীজ থেকেই তো তাল গাছ হবে। তাই তালের বীজ লাগানো হচ্ছে। বীজ ছাড়া তো গাছ হবে না।  
এদিকে চলমান আবহ্ওায়া পরিস্থিতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ অবহিতকরণের লক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মঙ্গলবার (০১ মে) বেলা ১১ টায় সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রেস ব্রিফিং আয়োজন করেছেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ২০ হাজার টাকা এবং আহত ব্যাক্তিকে ৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়াও বজ্রপাতে নিহত পরিবার প্রতিমাসে সরকারের কাছ থেকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ৩০ কেজি চাল পান।
এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বলেছেন, মাঠে ঘাটে কর্মরত অবস্থায় বজ্রপাতে কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হলে সরকারের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে নিহত ওই শ্রমিকের পরিবারকে ২ লাখ টাকা অনুদান দেওয়ার বিধান রয়েছে। বর্তমানে এ তহবিলে ২৮৩ কোটি টাকা জমা রয়েছে। কৃষকরাও এ সুবিধা পাবেন, যদি মাঠে কাজ করা অবস্থায় কোনও কৃষকের মৃত্যু হয়। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন