রাজধানীতে দুই বাসের চাপায় হাত হারানো তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীবহাসানের দুই ভাইকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে নির্দেশে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আগামী এক মাসের মধ্যে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে ক্ষতিপূরণের অর্ধেক (৫০ লাখ) টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া রাজীবের খালা জাহানার পারভীন এবং রাজীবের গ্রামের বাড়ি বাউফলের সাবেক চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের ছেলে কাস্টমস কর্মকর্তা ওমর ফারুকের নামে সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় একটি যৌথ অ্যাকাউন্ট খুলতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল এবং পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫ জুন শুনানির দিন ঠিক করেন আদালত।
আদালতে রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল শুনানি করেন। অন্যদিকে বিআরটিসির পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মো. মনিরুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অরবিন্দ কুমার রায়।
আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, দুই বাসের পাল্লায় না ফেরার দেশে চলে যাওয়া কলেজছাত্র রাজীবের দুই ভাইকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনের মালিককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওই এক কোটি টাকার অর্ধেক, অর্থাৎ ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য দুই পরিবহনের মালিককে এক মাসের সময় দিয়েছে আদালত।
তিনি জানান, রাজীবের খালা জাহানারা পারভীন এবং রাজীবের গ্রামের বাড়ি বাউফলের সাবেক চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের ছেলে কাস্টমস কর্মকর্তা ওমর ফারুকের নামে সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় একটি যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলা হবে। বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনের মালিককে এক মাসের মধ্যে ২৫ লাখ টাকা করে মোট ৫০ লাখ টাকা জমা দিতে হবে ওই অ্যাকাউন্টে। টাকা জমা দেয়ার বিষয়টি ২৫ জুনের মধ্যে আদালতকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ২৫ জুন বিষয়টি আবার আদালতে এলে তখনই বাকি ৫০ লাখ টাকার বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারে আদালত।
এদিকে হাইকোর্টের এ রায়ের পর আদালতের বারান্দায় দেখা যায় স্বজন পরিবহনটির গাড়ির মালিককে।
এ সময় দুঃখ প্রকাশ করে এ প্রতিকবেদককে বাসটির মালিক বলেন, আমি দিন এনে দিন খাই। অভাবের সংসার। সারা জীবনের সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে ৬ মাস আগে কিস্তিতে একটি গাড়ি কিনেছি। দুর্ভাগ্যক্রমে সেটির সঙ্গে দুর্ঘটনায় কলেজছাত্র রাজীবের মৃত্যু। হাইকোর্ট আমাকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাজীবের পরিবারকে দিতে বলেছে। আমি তো এত টাকা এক সঙ্গে কখনো চোখে দেখিনি। কীভাবে দেব তার পরিবারকে।
স্বজন পরিবহনের মালিক বলেন, ৬ মাস আগে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে র‌্যাংগস মোটরস থেকে একটি গাড়ি কিস্তিতে নিয়েছি। স্বজন পরিবহনের ব্যানারে গাড়িটি রোডে চলে। এক শিফট আমি চালাই আরেক শিফট চালায় ড্রাইভার মো. খোরশেদ। সে এক শিফটের বিনিময়ে আমাকে দুই হাজার টাকার মতো দেয়। স্বজন পরিবহনের ব্যানারে গাড়িটি চলার জন্য প্রতি মাসে ব্যানারের মালিককে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। আর মাসে গাড়ির কিস্তি বাবদ দিতে হয় ৪২ হাজার টাকা। সব মিলে খরচ হয় ৫০ হাজার টাকার মতো।
তিনি বলেন, আমার যদি সমর্থন থাকত আমি রাজীবের পরিবারকে টাকা দিয়ে দিতাম। আদালতের নির্দেশকে তো কখনো অমান্য করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, স্বজন পরিবহনের ব্যানারে রোডে চলে ৪০টি গাড়ি। ৪০টি গাড়ির মালিক ৪০ জন।
অপরদিকে বিআরটিসি বাসটি জিম্মায় নেয়ার আবেদনকারী আজাহার আলী বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। আমি গাড়ি জিম্মায় নিতে এসেছি। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।
উল্লেখ্য,গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সরকারি পরিবহন সংস্থা-বিআরটিসি ও বেসরকারি স্বজন পরিবহনের চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর শিকার হন রাজীব। এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ৪ এপ্রিল রিট আবেদন করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার পাশাপাশি রুল জারি করেন। রাজীবের চিকিৎসার খরচ স্বজন পরিবহন মালিক ও বিআরটিসিকে বহনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি টাকা দিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়।
গত ১৬ এপ্রিল রাজীব মারা যান। এ অবস্থায় সোমবার এ তথ্য আদালতকে অবহিত করা হয়। রাজীবের বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন। পড়ালেখার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার টাইপ করে তিনি নিজের এবং ছোট দুই ভাইয়ের খরচ চালাতেন।
ছোট দুই ভাই মেহেদি ও আবদুল্লাহ তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় সপ্তম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। সংসারে এক মাত্র অভিভাবক বড় ভাই রাজীবের মৃত্যুর পর অসহায় পড়েন দুই এতিম ভাই।